তারেক রহমান বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং জিয়াউর রহমান (বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি) ও খালেদা জিয়া (বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি’র চেয়ারপারসন)-এর বড় ছেলে। তারেক বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছেন। এখানে তার জীবন এবং রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হল:
১. শৈশব ও শিক্ষা :
- জন্ম: তারেক রহমান ১৯৬৭ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া এর প্রথম সন্তান।
- পারিবারিক পটভূমি: তারেক রহমান একটি রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, যেখানে তার বাবা, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দলের (BNP) প্রতিষ্ঠাতা এবং রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তার মা, খালেদা জিয়া, দুইবারের প্রধানমন্ত্রী এবং BNP’র চেয়ারপারসন।
- শিক্ষা: তারেক তার প্রাথমিক শিক্ষা বাংলাদেশে অর্জন করেন এবং পরে যুক্তরাজ্যে যান। তিনি লন্ডনের ওয়েস্টমিনিস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসনে (Business Administration) পড়াশোনা করেন। সেখানে থাকাকালীন তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করেন।
২. রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং বিএনপি তে নেতৃত্ব :
- রাজনৈতিক জড়িততা: তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল তার বাবার মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালে। খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর, তারেক ধীরে ধীরে দলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে থাকেন। বিশেষ করে, ১৯৯১ সালে তার মা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর, তিনি দলের অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেন।
- প্রথম নির্বাচনে অংশগ্রহণ (২০০১): ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে, বিএনপি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিজয়ী হয় এবং সরকার গঠন করে। তারেক রহমান বগুড়া-৬ আসন থেকে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। তিনি দলের নির্বাচনী প্রচারণায় এবং রাজনীতির সামগ্রিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
- বিএনপি’র নেতৃত্ব: ২০০৩ সালে তাকে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে তাকে দলের ভবিষ্যত নেতৃত্ব হিসেবে দেখা হতে থাকে এবং তিনি বিএনপির কর্মকাণ্ডের দিকে নজর রাখেন। তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কৌশল ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।
৩. আইনি সমস্যাগুলি এবং বিতর্ক :
- দুর্নীতির অভিযোগ: তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবন আইনি সমস্যাগুলি এবং দুর্নীতির অভিযোগের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। ২০০৭ সালে, তাকে বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশন (ACC) দ্বারা দুর্নীতি, অর্থপাচার, এবং অন্যান্য অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, তিনি সরকারি পদে থাকাকালীন বিশাল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
- গ্রেপ্তার এবং মুক্তি: তারেক রহমানকে একাধিক দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়, তবে তার পরিবার এবং দল অভিযোগ করে যে, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ২০০৮ সালে তিনি জামিন পান এবং চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে চলে যান। এরপর থেকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে অবস্থান করেন।
- বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন: ২০১৮ সালে, দীর্ঘ বিদেশে অবস্থান করার পর, তারেক রহমান বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তবে তার বিরুদ্ধে এখনও আইনি মামলা চলমান রয়েছে, যা তাকে পুরোপুরি দেশে সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করতে বাধা দেয়।
৪. বিএনপি’র ভিতরে তার প্রভাব :
- রাজনৈতিক প্রভাব: তারেক রহমান বিএনপির সিনিয়র নেতা হিসেবে দলের ভিতরে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। তিনি দলের কর্মসূচী এবং কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, এবং অনেকেই তাকে বিএনপির ভবিষ্যত নেতা হিসেবে মনে করেন।
- ২০১৮ সালের নির্বাচন: ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির প্রচারণায় এবং রাজনৈতিক কৌশলে তারেক রহমানের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, যদিও তিনি আইনি সমস্যার কারণে সরাসরি নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তবে, তিনি বিদেশ থেকে দলের পক্ষে নির্দেশনা দিতে থাকেন।
৫. ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবারের বিবরণ :
- পরিবার: তারেক রহমান জুবায়দা রহমান কে বিয়ে করেছেন, এবং তাদের একটি সন্তান রয়েছে। তারেক পরিবারের প্রতি একটি গভীর সংযোগ অনুভব করেন এবং তার মা, খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
- স্বাস্থ্য সমস্যা: তারেক রহমানের স্বাস্থ্য সমস্যা ছিল, যার কারণে তাকে প্রায় সময় বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে হয়েছে। তার হৃদরোগজনিত সমস্যা এবং চিকিৎসার জন্য দীর্ঘদিন ধরে তিনি লন্ডনে অবস্থান করেছিলেন।
৬. ভবিষ্যত রাজনীতি এবং উত্তরাধিকার
- বিএনপির ভবিষ্যত নেতৃত্ব: তারেক রহমান বিএনপির ভবিষ্যত নেতৃত্ব হিসেবে দৃশ্যমান। তারেকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং তার পরিবারের ঐতিহ্য তাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার সুযোগ দিচ্ছে। যদিও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তবে তার সমর্থকরা তাকে দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায়।
- রাজনৈতিক বিভাজন: তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিতর্কিত চরিত্র। তার সমর্থকরা তাকে শক্তিশালী নেতা হিসেবে দেখে, তবে তার বিরোধীরা তাকে দুর্নীতিপরায়ণ এবং স্বেচ্ছাচারী হিসেবে আখ্যায়িত করে। বাংলাদেশে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং বিএনপির পরবর্তী পদক্ষেপের উপর নির্ভর করবে।
তারেক রহমান বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া এর পুত্র হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্তিশালী একটি পরিচয় তৈরি করেছেন। যদিও তার বিরুদ্ধে আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে বিএনপি’র ভবিষ্যত রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বের দিকে সবার নজর রয়েছে।